Tuesday, January 13, 2026
Homeবাংলাদেশকুমিল্লালাতিন আমেরিকা কেন ট্রাম্পের টার্গেট?

লাতিন আমেরিকা কেন ট্রাম্পের টার্গেট?

বিশ্বব্যাপী আধিপত্য হারানো এবং চীন, রাশিয়া ও ভারতের মতো উদীয়মান শক্তিগুলোর জোটবদ্ধ হওয়ার মুখোমুখি হয়ে অনেকটাই কোণঠাসা হয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশেষ করে, সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রভাব অনেকটাই হ্রাস পায়। ক্ষমতায় আসার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ বা ‘মাগা’ কর্মসূচির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে আবার শক্তিশালী অবস্থানে নিতে চাইছেন। এ জন্য তিনি বৈশ্বিক ক্ষমতার বর্তমান কাঠামোকে বদলে দিতে চান । আর এর পন্থা হিসেবে তিনি প্রথমেই আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য বেছে নিয়েছেন লাতিন আমেরিকাকে। ভেনেজুয়েলায় আগ্রাসন তার এই পদক্ষেপের প্রথম ধাপ।

ট্রাম্পের ‘মাগা কর্মসূচি বাস্তবায়নের কৌশল হিসেবে তার টার্গেট করা অঞ্চল ও দেশগুলোয় বলপ্রয়োগ, হুমকি এবং বিশৃঙ্খলা আরোপের নীতি গ্রহণ করেছে তার প্রশাসন। এর ওপর ভিত্তি করে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী নীতিকে আবার সক্রিয় করেছে। আর এর প্রথম ধাপে থাকছে লাতিন আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী দেশগুলো। ভেনেজুয়েলাকে দিয়েই ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্রকে ‘মহান’ করার প্রক্রিয়াটি শুরু হলো। এর পরবর্তী টার্গেট হিসেবে তিনি ইতোমধ্যেই কলম্বিয়া, কিউবা ও মেক্সিকোকে হুমকি দিয়েছেন, তালিকায় রেখেছেন উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশ ইরানকেও।

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ একটি আগ্রাসনের চেয়েও অনেক বেশি বিপজ্জনক কিছু। এটি শতাব্দী প্রাচীন মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের সর্বশেষ উদাহরণ, যা লাতিন আমেরিকাকে নতুন করে শঙ্কিত করে তুলেছে। কারাকাসে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের অভিযান স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়, ট্রাম্প প্রশাসন নতুন করে উৎসাহের সঙ্গে হস্তক্ষেপের এই পুরোনো নীতি গ্রহণ করছে, যা এই অঞ্চলের জন্য একটি অশুভসংকেত। বিশেষ করে, লাতিন আমেরিকার জন্য। কারণ এর প্রভাব ভয়াবহ। ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলা ও প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে ধরে নিয়ে যাওয়া কেন সমগ্র অঞ্চলে আতঙ্ক ছড়িয়েছে, তা বুঝতে হলে এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অতীত কর্মকাণ্ডের দিকে নজর দিতে হবে। অতীতে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলের দেশগুলোয় সামরিক অভ্যুত্থানে সহায়তা ও এবং সামরিক একনায়কতন্ত্রকে সমর্থন দিয়েছে।

১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালায় গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত জ্যাকোবো আরবেনজের সরকারকে উৎখাত করে সিআইএ। ১৯৭৩ সালে চিলিতে অভ্যুত্থানকে সমর্থন করে যুক্তরাষ্ট্র, যা অগাস্টো পিনোশেকে ক্ষমতায় আনে এবং অনিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক সহিংসতার যুগের সূচনা করে। ১৯৮৩ সালে গ্রেনাডা দ্বীপ আক্রমণ করে এর সমাজতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাতের জন্য দেশটি দখল করে যুক্তরাষ্ট্র। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, উরুগুয়ে এবং সমগ্র মধ্য আমেরিকার দেশগুলোয় সামরিক সরকারকে প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন এবং রাজনৈতিক আবরণ প্রদান করেছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত এসব সামরিক সরকার ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন এবং বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা করেছে।

যদি যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় এত সহজেই শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করে ফেলতে পারে, তাহলে তাদের পক্ষে এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশেও একই কাজ সহজেই করা সম্ভব। এখন প্রশ্ন হলোÑপরবর্তী টার্গেট কে? কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেট্রো ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তিনি ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসনেরও দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। কারণ ডিসেম্বরে ট্রাম্প কলম্বিয়ায় হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, ‘পরবর্তী টার্গেট হবেন তিনি।’ ট্রাম্পের এই হুমকিতে এই অঞ্চলের অন্য শাসকরাও উদ্বিগ্ন।

বস্তুতপক্ষে ট্রাম্প প্রশাসন বর্তমানে যে পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে তা কোনো সত্যিকারের কূটনীতি নয়, বরং তা হচ্ছে প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল এবং মিডিয়া কারসাজির ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা একটি পররাষ্ট্রনীতি। এর মাধ্যমে আগ্রাসনের পথ তৈরি করা হচ্ছে। আগ্রাসনের এই নীতিকে বৈধতা দিতে ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্র ‘গণতন্ত্র রক্ষা’ বা ‘মাদক পাচারের বিরুদ্ধে লড়াই’ এর বয়ান তৈরি করেছে এবং এই বয়ানকে ন্যায্যতা দিতে যা যা করা প্রয়োজন, তার সবকিছুই করছে ওয়াশিংটন।

কিন্তু এই বয়ানের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের আসল স্বার্থ ও উদ্দেশ্য হলোÑলাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে থাকা তেল, সোনা, তামা, গ্যাস এবং লিথিয়ামের মতো কৌশলগত সম্পদ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া। গুরুত্বপূর্ণ এসব সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখতে এখন মরিয়া যুক্তরাষ্ট্র। ভেনেজুয়েলা ট্রাম্প প্রশাসনের এই আগ্রাসনের নীতির প্রথম প্রথম শিকার। বিশাল তেলের ভান্ডার, ওরিনোকো মাইনিং আর্কের খনিজসম্পদ, গায়ানা শিল্ডের সোনার মজুত এবং আমাজনের বিশাল জল সম্পদ দখলে নেওয়া ধনকুবের ট্রাম্পের শীর্ষ অগ্রাধিকার।

ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের এই আগ্রাসন আদর্শিক কোনো বিষয় নয়; বরং মূলে আছে অর্থনৈতিক এবং ভূকৌশলগত। একইভাবে, গ্যাস ও তেলসম্পদে সমৃদ্ধ এবং বর্তমানে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে আঞ্চলিক বিরোধে জড়িয়ে পড়া গায়ানাকেও নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায় ট্রাম্প প্রশাসন। নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত ও ধরে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে ভেনেজুয়েলায় নিয়ন্ত্রণে আনা, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা এবং সামরিক করিডোর সুসংহত করার লক্ষ্যে এখন কাজ করছে ট্রাম্প প্রশাসন। ভেনেজুয়েলায় আগ্রাসন ওয়াশিংটনের স্বার্থের জন্য কৌশলগত খুবই গুরুত্বপূর্ণ দেশ কলম্বিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথকেও উন্মুক্ত করেছে।

কলম্বিয়াকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ২০০০ সালে ‘প্ল্যান কলম্বিয়া’ কর্মসূচি গ্রহণ করে, যা এখন তার ২৫তম বার্ষিকী উদযাপন করছে। এই পরিকল্পনার আওতায় নিরাপত্তা, গোয়েন্দা এবং সামরিকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কলম্বিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের কাঠামোগত অধীনে রাখার একটি মডেল হিসেবে চালু করা হয়েছিল।

কলম্বিয়াকে ‘মাদকবিরোধী সহযোগিতা’ প্রদানের আড়ালে যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক, লজিস্টিক এবং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য একটি বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। এই নেটওয়ার্ক আজ ক্যারিবিয়ান, আমাজন অঞ্চলসহ সমগ্র দক্ষিণ আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কৌশলের একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে।

এখানে ব্রাজিলের ভূমিকা তুলে ধরাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশটি ‘মাদক পাচারের বিরুদ্ধে লড়াই’-এর একই মার্কিন বয়ানের অধীনে ক্রমবর্ধমানভাবে চাপের মধ্যে রয়েছে। আমরা আবার প্রত্যক্ষ করছি যে, কীভাবে মার্কিন হস্তক্ষেপকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য ওয়াশিংটনের এই বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তব্যের মাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে দেশটিতে বিশৃঙ্খলা উসকে দেওয়া এবং তা বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে।

মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সম্প্রসারণ, গোপন অভিযান চালানো এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারণার মাধ্যমে এই অঞ্চলে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী মনোভাব আরো প্রকাশ্যে চলে এসেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অনুগত সরকারগুলোর কোনো বিপদ না হলেও যেসব দেশ নিজেদের মতো করে পথ চলতে চায়, সেগুলো অস্থিতিশীল করে তোলার নীতি অব্যাহত রাখবে যুক্তরাষ্ট্র।

ইকুয়েডর, পেরু, আর্জেন্টিনা এবং চিলিতে যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতি স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। ওয়াশিংটন এসব দেশে স্থানীয় রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক অভিজাতদের সঙ্গে জোট গড়ে তোলার মাধ্যমে তার প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে এবং আধিপত্য বিস্তারের উপায় হিসেবে এসব দেশে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়েছে।

অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকে নিজেদের হস্তক্ষেপকে ন্যায্যতা দেওয়ার এবং নিয়ন্ত্রণকে স্থায়ী করার একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্র। এই প্রেক্ষাপটে কলম্বিয়াও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও রাজনৈতিক বয়ান তৈরির জন্য কলম্বিয়াকেও বেছে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ভেনেজুয়েলাকে দখল করে দেশটির জ্বালানি সম্পদ দীর্ঘ মেয়াদে নিয়ন্ত্রণ করার টার্গেট বাস্তবায়ন শুরু করেছে ট্রাম্প প্রশাসন।

উভয় ক্ষেত্রেই ওয়াশিংটন একই চিত্রনাট্য অনুসরণ করছে। সেগুলো হচ্ছে দেশটিতে নানা ধরনের দুর্বলতা তৈরি করা, অভ্যন্তরীণ সংঘাত উসকে দেওয়া এবং দেশটির জাতীয় সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অজুহাত হিসেবে ‘মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ বা ‘মানবাধিকার রক্ষার’ বক্তৃতা ব্যবহার করা হচ্ছে। এই কৌশলের অন্তর্নিহিত যুক্তি হচ্ছেÑযুক্তরাষ্ট্র কখনোই স্বায়ত্তশাসিত, মর্যাদাপূর্ণ বা সার্বভৌম কোনো সরকারকে সহ্য করে না। হোয়াইট হাউসে যে দলই থাকুক না কেন, তারা এ ব্যাপারে একই নীতি অনুসরণ করে। তাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল কথা হচ্ছে, হস্তক্ষেপ এবং বলপ্রয়োগের একটি ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় পোষ্ট