ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময়ে ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে এক দফার ঘোষণায় ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ করে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা বলেছিলেন সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’ কথাটি প্রথমে ছিল একটি ধারণা; রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও নাগরিকের সম্পর্ক পুনর্গঠনের আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু অভ্যুত্থানের দেড় বছরেও নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের খুব বেশি চর্চা বা উদাহরণ তৈরি করতে পারেনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কিংবা নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
তবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের ধারণাকে চর্চায় রূপ দেওয়ার যে বিরল দৃষ্টান্ত দেখা যায়, তার অন্যতম নাম শরীফ ওসমান হাদি। তিনি নতুন বন্দোবস্তকে কেবল বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং নিজের রাজনৈতিক আচরণ, নির্বাচন পদ্ধতি ও সাংগঠনিক সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে সেটিকে বাস্তব রূপ দিয়েছেন। ওসমান হাদির রাজনৈতিক বন্দোবস্তের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল—ক্ষমতা নয়, নৈতিকতা; আধিপত্য নয়, অংশগ্রহণ; পুঁজিনির্ভর রাজনীতি নয়, জনগণনির্ভর রাজনীতি।
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে রাজনীতির পুনঃসংযোগ ঘটিয়েছিলেন ওসমান হাদি। ওসমান হাদি তার নির্বাচনি যাত্রা শুরু করেছিলেন শাহবাগ জাদুঘরের গেটে মিলাদের মাধ্যমে, যেখানে আবহমান গ্রামবাংলার মানুষের ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং একইসঙ্গে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের খাবার বাতাসা-মুড়ি বিতরণ করা হয় উপস্থিত জনসাধারণের মাঝে। এটি কেবল প্রতীকী নয়, বরং ওসমান হাদির রাজনৈতিক দর্শনের প্রকাশ। বাংলার ঐতিহ্য, ধর্মীয় অনুভূতি ও নৈতিকতা রাজনীতির বাইরে নয়, বরং তার নৈতিক ভিত্তি। শক্তি প্রদর্শন নয়, দোয়ার মাধ্যমে রাজনীতির সূচনা ছিল ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির প্রতি এক নীরব প্রতিবাদ।
পেশিশক্তির রাজনীতির বিকল্প রাজনৈতিক মডেল তথা নতুন বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত চেয়েছিলেন ওসমান হাদি। তাই তার প্রচারণায় ছিল না কোনো বড় বহর, শোডাউন বা জনতার ভিড় দিয়ে ভয় তৈরির চেষ্টা। তিনি নিজ পায়ে হেঁটে, ছোট টিম নিয়ে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গেছেন। এটি ছিল দৃশ্যমানভাবে পেশিশক্তিনির্ভর রাজনীতির অবসান ঘোষণা, যেখানে নেতা মানুষের কাছে যান, মানুষকে জড়ো করে শক্তি দেখান না, মানুষের বিরক্তির কারণ হন না। রাস্তাঘাটে জড়ো হয়ে ভয়ার্ত পরিবেশ তৈরি, দোকানির জন্য অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি, ফুটপাত ও রাস্তা বন্ধ করে নাগরিকদের কষ্ট দিয়ে প্রচারণা—এগুলোর পরিবর্তনে তিনি আওয়াজ তুলেছেন, নিজে তা বাস্তবায়নে কঠোর পরিশ্রম করে উদাহরণ তৈরি করছেন।
অর্থবিত্তের রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে রাজনীতিকে অর্থনির্ভরতা থেকে বের করে জনতার রাজনীতি বিনির্মাণে কাজ করেছেন ওসমান হাদি। তিনি করপোরেট ফান্ড, বিনিয়োগকারী বা কালোটাকার ওপর নির্ভর করেননি। তার নির্বাচনি ব্যয় পরিচালিত হয়েছে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ‘হাদিয়া’ দিয়ে। এখানে অর্থ ছিল নিয়ন্ত্রক নয়, বরং আস্থার প্রতীক। এই চর্চা রাজনীতিকে পুঁজির দাসত্ব থেকে মুক্ত করার একটি মৌলিক দৃষ্টান্ত। রাজনীতি করতে অর্থবিত্তের বলয় দরকার, বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন—এই প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে রাজনীতির জন্য কেবল জনগণ দরকার তার উদাহরণ তৈরি করছেন। শহুরে ব্যয়বহুল রাজনীতির বদলে গ্রামবাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে রাজনৈতিক ভাষায় ফিরিয়ে আনার প্রয়াসে বাতাসা-মুড়ি, শোডাউন বা বহর নয়, খরচবিহীন ভলান্টিয়ার টিম নিয়ে প্রচারণা, জনগণের কণ্ঠস্বরে কথা বলায় স্বতঃস্ফূর্ত নির্বাচনি তহবিল সংগ্রহ এবং কস্ট-ইফেক্টিভ মডেলে জনতার রাজনীতি বিনির্মাণে কাজ করেছেন তিনি।
রাষ্ট্রীয় আইন মেনে পরিবেশবান্ধব রাজনীতির চর্চা করেছেন ওসমান হাদি। তিনি প্রচলিত অবৈধ মোটরসাইকেল শোডাউন, তিনজন নিয়ে অইন লঙ্ঘন করে হেলমেটবিহীন মোটরসাইকেলে উচ্চ হর্ন ও শব্দদূষণের রাজনীতি গ্রহণ করেননি। এগুলো এড়িয়ে পরিবেশবান্ধব ভ্যানগাড়ি ব্যবহার করেছেন। এটি ছিল আইনের প্রতি শ্রদ্ধা, পরিবেশ সচেতনতা এবং রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার প্রতি রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রকাশ, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রায় অনুপস্থিত। তার এ নতুন বন্দোবস্ত একই সঙ্গে অর্থসাশ্রয়ী, উপযোগী ও জনবান্ধব। হাদির বড় ফেস্টুন, বড় ব্যানার ও বিলবোর্ডবিহীন প্রচারণা ছিল নগরসৌন্দর্য ও আইন মানার রাজনীতি। কেবল লিফলেটের মাধ্যমে বার্তা পৌঁছানো ছিল পরিবেশ ও নাগরিক অধিকার সচেতন রাজনৈতিক আচরণ।
কেবল কথায় ফুলঝুরি বা প্রতিশ্রুতি নয়, জনগণনির্ভর ইশতেহার তৈরি করতে এগিয়েছিলেন ওসমান হাদি। তিনি ভোটার-যোগ নামে ক্যাম্পেইনে বোর্ড নিয়ে জনগণের দোরগোড়ায় গিয়ে ইশতেহার চাইতেন। জনগণ লিখে দিত তারা কী চায়। তার আলোকে সে যেগুলো পূরণ করতে পারবে তার ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে সেগুলো চূড়ান্তভাবে সাজিয়ে ঘোষণা করতে চেয়েছিলেন। কোনো অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দেননি তার প্রচারণায়, বরং তিনি বিশ্বাস করতেন, জনগণের কথা শোনাই রাজনৈতিক কর্মসূচির বিষয়। জন-আকাঙ্ক্ষাই ছিল তার ইশতেহার। এটি প্রতিনিধিত্বমূলক রাজনীতির একটি নতুন ব্যাখ্যা।
রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বাস্তব প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন হাদি। তিনি মাস শেষে ফেসবুক লাইভে নির্বাচনি ফান্ডের হিসাব প্রকাশ করতেন। বাংলাদেশে যেখানে রাজনীতি মানেই অস্বচ্ছতা, সেখানে এই চর্চা ছিল প্রায় বিপ্লবাত্মক। এটি নাগরিকের প্রতি রাজনীতিবিদের নৈতিক জবাবদিহিতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। প্রতিপক্ষের প্রতি সম্মান ও সহাবস্থানের রাজনীতি করেছেন তিনি। ওসমান হাদি রাজনীতিকে শত্রুতা হিসেবে দেখেননি। রিকশাচালক প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে শুরু করে জামায়াত, বিএনপি—সবাইকে তিনি সম্মান করেছেন। আক্রমণ নয়, সহাবস্থান ছিল তার রাজনৈতিক নীতি। এখানেই গণতান্ত্রিক সৌন্দর্য পূর্ণতা পায়।
নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে ওসমান হাদির রাজনৈতিক বন্দোবস্ত কোনো দলীয় মডেল নয়; এটি একটি নৈতিক রাজনৈতিক দর্শন। তিনি দেখিয়েছেন, নতুন বাংলাদেশ মানে শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং রাজনৈতিক আচরণ, ভাষা ও সংস্কৃতির আমূল রূপান্তর। তার জীবন প্রমাণ করে, রাজনীতি আবার মানুষমুখী, নৈতিক ও সাংস্কৃতিক হতে পারে। এই বন্দোবস্তই তাকে ক্ষণজন্মা হলেও কিংবদন্তি করে তুলেছে। নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে সব রাজনৈতিক দলের উচিত ওসমান হাদির এ উদাহরণগুলো চর্চায় নিয়ে আসা।

