Wednesday, February 4, 2026
Homeজাতীয়শহীদদের ৮০ ভাগই তরুণ, সাধারণ মানুষ

শহীদদের ৮০ ভাগই তরুণ, সাধারণ মানুষ

ঢাকার শাপলা চত্বরের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে ২০১৩ সালের ৬ মে রাষ্ট্রীয় বাহিনী সহিংসভাবে দমন করেছিল। নিহতদের ৮০ শতাংশ সাধারণ মানুষ, যারা মাদরাসার ছাত্র ছিলেন না, তাদের গড় বয়স ছিল ২৯ বছর। মৃত্যুর প্রায় ৮৫ শতাংশ ঘটেছিল গুলির আঘাতে।

বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশনের পরিচালিত এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। এই তথ্য প্রথাগত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে যে, শাপলা আন্দোলন কেবল মাদরাসাকেন্দ্রিক ছিল।

৬ জানুয়ারি শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড (২০১৩) : বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি দৃষ্টান্ত শিরোনামে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

গবেষণাটি করেছেন মোহাম্মাদ সরোয়ার হোসেন, মুনাইম খান, সাদীদ হোসেন এবং এস এম ইয়াসির আরাফাত।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৩ সালের শুরুতে বাংলাদেশে ধর্মীয় অনুভূতি উদ্রেককারী মন্তব্য এবং ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে সামাজিক উত্তেজনা দেখা দেয়। ইসলামবিদ্বেষী মন্তব্যের প্রতিবাদে হেফাজতে ইসলাম আন্দোলন শুরু করে এবং ২০১৩ সালের ৬ এপ্রিল ‘লং মার্চ’-এ লাখ লাখ মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে অংশ নেয়। হেফাজতের ১৩ দফা দাবি পূরণ না হওয়ায় ৫ মে ২০১৩ পুনরায় বিশাল সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়।

প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়, ভোররাতে ৬ মে সরকারি বাহিনী নিরস্ত্র প্রতিবাদকারীদের ওপর পরিকল্পিত হামলা চালায়। বিদ্যুৎ সংযোগ এবং সাউন্ড সিস্টেম ইচ্ছাকৃতভাবে বিচ্ছিন্ন করা হয়। প্রায় ৭৫০০ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাত্র ২০ মিনিটে হামলা চালায়। হামলার সময় টিয়ার গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড, ফুটন্ত পানি এবং তাজা গুলি ব্যবহার করা হয়। এই হামলায় অন্তত ৫০ হাজার প্রতিবাদকারীকে ছত্রভঙ্গ করা হয়।

এতে বলা হয়, শাপলা অভিযানে পুলিশ ৫ হাজার ৭১২ জন, র‍্যাব ১,৩০০ জন এবং বিজিবি ৫৭৬ জন অংশ নেন। ব্যবহৃত হয়েছে গোলাবারুদ ১,৫৫,০০০ রাউন্ড, তাজা গুলি ৮০,০০০, টিয়ার শেল ৬০,০০০, রাবার বুলেট ১৫,০০০, শটগান ১২,০০০, সাউন্ড গ্রেনেড এবং ৩৫০ রিভলবার শটগান।

নিহত ব্যক্তির সংখ্যা নির্দিষ্টভাবে জানা না গেলেও বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অন্তত ৫৮ জন, অধিকার ৬১ জন এবং হেফাজতে ইসলাম ৯৩ জন মৃত্যুর কথা উল্লেখ করেছে। বেওয়ারিশ লাশ দাফনকারী সংস্থা আনজুমান-এ-মফিদুল ইসলামের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মে মাসে দাফনকৃত মরদেহের সংখ্যা অন্যান্য মাসের তুলনায় প্রায় চারগুণ বেশি। অনুমানকৃত মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৯৩ থেকে ৩২৭ জনের মধ্যে হতে পারে।

৬১ জন নিহতের বিশদ জনতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ৯ জন মাদরাসা শিক্ষার্থী, ৪ জন মাদরাসা শিক্ষক/ইমাম, ৯ জন স্কুল বা কলেজ শিক্ষার্থী, ৫ জন চাকরিজীবী, ৬ জন পোশাক/কারখানা শ্রমিক, ৭ জন ড্রাইভার/রিকশা চালক/ভ্যান চালক, ৫ জন হকার/ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী/সবজি বিক্রেতা, ২ জন সাংবাদিক, ২ জন রাজমিস্ত্রি/ইলেক্ট্রিশিয়ান, ৪ জন বাস/ভ্যান হেল্পার, ৩ জন দর্জি/দিনমজুর/কৃষক এবং ৫ জন অজানা পেশার। অর্থাৎ মোট ৪৮ জন সাধারণ নাগরিক, যারা মাদরাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের বাইরে থেকে এসেছিলেন।

নিহতের মৃত্যুর কারণও বিশদভাবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। ১৪ জন মাথায় গুলির আঘাতে, ১৯ জন বুক-পেট-কোমরে গুলির আঘাতে, ২০ জন অনির্দিষ্ট স্থানে গুলির আঘাতে, ১ জন ছুরিকাঘাতে এবং ২ জনকে পিটিয়ে মারা হয়েছে। অর্থাৎ মোট মৃত্যুর প্রায় ৮৫ শতাংশ ঘটেছে গুলির আঘাতে।

অভিযান চলাকালে দিগন্ত টেলিভিশন ও ইসলামিক টেলিভিশন বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং কোনো বিচারিক তদন্ত করা হয়নি। ২০২৪ সালে সরকারের পতনের পরই শাপলা হত্যাকাণ্ডের মামলা দায়ের করা হয়।

গবেষকরা উল্লেখ করেছেন, শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন অনুযায়ী মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। এটি পরিকল্পিত, সুশৃঙ্খল এবং বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর লক্ষ্যবস্তু হামলার উদাহরণ। হামলার উদ্দেশ্য, প্রস্তুতি এবং পরিমাণ সবই এই শ্রেণীবিন্যাসকে সমর্থন করে।

গবেষণা টিমের সদস্য ড. মোহাম্মাদ সরোয়ার হোসেন বলেন, শাপলা হত্যাকাণ্ডের প্রভাব ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয়। ব্যক্তিগতভাবে হতাহত পরিবারের সদস্যরা মানসিক চাপ, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক অসুস্থতা, শোক এবং বিষণ্ণতা অনুভব করেছেন। সামাজিকভাবে এ ধরনের হামলা ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে এবং ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে সংঘাতের সৃষ্টি করেছে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নাগরিক নিরাপত্তা ও মানবাধিকার হুমকির মুখে পড়েছে।

গবেষণার উপসংহারে বলা হয়েছে, শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ড রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট সহিংসতার একটি চরম উদাহরণ। এটি প্রমাণ করে যে, নিহতদের ৮০ শতাংশ সাধারণ নাগরিক ছিলেন, যারা রাজনৈতিক আনুগত্যের চেয়ে ধর্মীয় আবেগে উদ্বুদ্ধ হয়ে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং ভবিষ্যতে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও বিচারের মাধ্যমে এর ইতিহাস, সাক্ষ্য ও ফরেনসিক প্রমাণ সমন্বিত করা অত্যাবশ্যক।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় পোষ্ট