Wednesday, February 11, 2026
Homeজাতীয়দ্বৈত নাগরিকত্বের ফাঁড়া কাটল অধিকাংশ প্রার্থীর

দ্বৈত নাগরিকত্বের ফাঁড়া কাটল অধিকাংশ প্রার্থীর

আসন্ন সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের দ্বৈত নাগরিকত্বের ফাঁড়া কেটেছে। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের বাছাইয়ে দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুতে বেশকিছু প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হলেও নির্বাচন কমিশনে আপিল করলে তাদের প্রায় সিংহভাগই প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। পাশাপাশি দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছেÑএমন অভিযোগ তুলে রিটার্নিং কর্মকর্তা ঘোষিত কিছু বৈধ প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল চেয়ে ইসিতে আবেদন পড়লে তা নাকচ হয়ে গেছে।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, দ্বৈত নাগরিক ইস্যুতে ২৪ প্রার্থীর মধ্যে ২১ জনের প্রার্থিতা বহাল রেখেছে ইসি। তিনজনের প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে এবং একজনের সিদ্ধান্ত অপেক্ষমাণ (পেন্ডিং) রাখা হয়েছে।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, আইনজীবীদের মতামতের ভিত্তিতে দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুতে কমিশন সিদ্ধান্ত গ্রহণে কিছুটা নমনীয়তা দেখিয়েছে। এক্ষেত্রে মনোনয়নপত্র দাখিলের আগে কেউ যথাযথ নিয়মে বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন দিলে তাদের বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। কমিশন দ্বৈত নাগরিকদের নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদনপত্র জমা, অ্যাফিডেভিট সংযুক্তকরণ এবং নির্ধারিত ফি জমা দেওয়ার প্রমাণ আমলে নিয়েছে।

আপিল শুনানির সমাপনী বক্তব্যে সিইসি এএমএম নাসির উদ্দিন বলেন, আপিল শুনানিতে আমরা পক্ষপাতিত্ব করে রায় দেইনি। আপনারা আপিল শুনানিতে যেভাবে সহযোগিতা করেছেন, আশা করি ভোটেও সেভাবে সহযোগিতা করবেন।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে এবার মোট দুই হাজার ৫৬৮টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছিল। এর মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের বাছাইয়ে ৭২৩ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তের (মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও বাতিল) বিরুদ্ধে ইসিতে ৬৪৫টি আপিল জমা পড়েছিল। এসব আপিলের বিষয়ে ইসিতে টানা ৯ দিন শুনানি হয়। শুনানির সময় ৪২২টি আপিল মঞ্জুর হয় এবং ১৯৫টি নামঞ্জুর হয়। শুনানিতে ২৮ আপিলকারী অনুপস্থিত থাকায় সেগুলোর বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আপিল শুনানিতে ৪২০ জনের মতো প্রার্থী তাদের মনোনয়ন ফিরে পেয়েছেন। এছাড়া বৈধ প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল চেয়ে বেশকিছু আবেদন পড়ে, যার বেশিরভাগ নাকচ হয়ে যায়। অবশ্য ইসির এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রার্থীরা চাইলে উচ্চ আদালতে যেতে পারবেন।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন আগামীকাল মঙ্গলবার। পরদিন বুধবার প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে। বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হবে নির্বাচনি প্রচার।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুতে বেশ কয়েকজন প্রার্থীকে যাছাই-বাছাইকালে রিটার্নিং কর্মকর্তারা অবৈধ ঘোষণা করেন। এসব প্রার্থী ইসিতে আপিল করেও সুফল পাননি। আবার দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছেÑএমন কয়েকজনের প্রার্থিতা রিটার্নিং কর্মকর্তা বাছাইকালে বৈধ ঘোষণা করলে তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইসিতে আপিল করেন। পরে ইসিতে ওই আপিলের কিছু মঞ্জুর হওয়ায় কয়েকজনের প্রার্থিতা বাতিল হয়ে গেছে। এছাড়া কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে আপিল না হলেও গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হওয়ার প্রেক্ষাপটে ইসি তাদের সুয়োমোটো জারি করেছে।

দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে কমিশনে শুনানিকে কেন্দ্র করে গত শনিবার দুপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে হট্টগোলের ঘটনাও ঘটে। এর জেরে ওই দিন দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুতে শুনানি হলেও ইসি সিদ্ধান্ত পেন্ডিং রাখে। গতকাল ইসি ওই আপিলগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেয়।

জানা গেছে, শনিবার আইনজীবীদের মতামতের ভিত্তিতে দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুতে কমিশন কিছুটা নমনীয়তা দেখায়। এক্ষেত্রে মনোনয়নপত্র দাখিলের আগে কেউ যথাযথ নিয়মে বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন জমা, দ্বৈত নাগরিকত্ব ত্যাগের অ্যাফিডেভিট এবং নির্ধারিত ফি জমা দিয়েছেন কি না, তা আমলে নেয় ইসি।

ফেনী-৩ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও দলটির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়াল মিন্টুর প্রার্থিতা বহাল রেখেছে ইসি। দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ তুলে তার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী ইসিতে আপিল করেছিলেন। তবে ওই আপিল নামঞ্জুর হয়েছে। মিন্টু মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন ২৯ ডিসেম্বরের মধ্যে নাগরিকত্ব বাতিলের আবেদন করেন। তিনি এ-সংক্রান্ত নির্ধারিত ফিও জমা দেন।

মিন্টু ছাড়াও দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগের তালিকায় থাকা বিএনপির শামা ওবায়েদ ইসলাম (ফরিদপুর-২), আফরোজা খানম রিতা (মানিকগঞ্জ-৩), মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরী (শেরপুর-২), কয়ছর এম আহমেদ (সুনামগঞ্জ-৩), একেএম কামরুজ্জামান (দিনাজপুর-৫), ডা. মনিরুজ্জামান (সাতক্ষীর-৪), কবির আহমেদ ভূঞা (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪), শওকতুল ইসলাম (মৌলভীবাজার-২) ও সুজাত মিয়া (হবিগঞ্জ-১); জামায়াতে ইসলামীর একেএম ফজলুল হক (চট্টগ্রাম-৯), ব্যারিস্টার মাহবুবুল আলম সালেহী (কুড়িগ্রাম-৩), ডা. মোসলেহ উদ্দীন (যশোর-২), নজরুল ইসলাম (ঢাকা-১), জোনায়েদ হাসান (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩); জাতীয় পার্টির খোরশেদ আলম (চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১) ও মঞ্জুর মালী (রংপুর-১), খেলাফত মজলিসের আজাদুল হক (নাটোর-১), এনসিপির এহতেশামুল হক (সিলেট-১) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী জহিরুল ইসলামের (নোয়াখালী-১) প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করেছে ইসি। অপরদিকে দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুতে আপিলে কুমিল্লা-১০ আসনে বিএনপির প্রার্থী আবদুল গফুর ভূঁইয়া, কিশোরগঞ্জ-১ আসনের ইসলামী আন্দোলনের আজিজুর রহমান এবং ময়মনসিংহ-৬ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তানভীর আহমেদ রানার প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। এছাড়া কুমিল্লা-৩ আসনের বিএনপির প্রার্থী মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদের সিদ্ধান্ত আজ দেবে বলে জানিয়েছে ইসি ।

সংবিধান ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী সংসদ নির্বাচনে দ্বৈত নাগরিকদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই। সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলে কেউ জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না অর্থাৎ সংসদ সদস্য হতে পারবেন না। দ্বৈত নাগরিকদের কেউ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলে বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হয়। অবশ্য দ্বৈত নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে সংসদ নির্বাচন করা না গেলেও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নির্বাচনে কোনো বাধা নেই। এজন্য সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের হলফনামায় একটি সুনির্দিষ্ট ঘর রয়েছে, যেখানে প্রত্যেক প্রার্থীকে দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হয়।

এদিকে, গতকাল মামুন হাওলাদার নামে এক ভোটার নিজেকে একজন সচেতন নাগরিক উল্লেখ করে দ্বৈত নাগরিকত্বসংক্রান্ত সংবিধান ও সুপ্রিম কোর্টের রায় লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) নাসির উদ্দিনের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন। এতে তিনি দাবি করেন, সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচন কমিশন শুধু নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন দাখিলের ভিত্তিতে কিছু প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করছে, যা সংবিধান ও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার পরিপন্থী। আবেদনে তিনি বলেন, সংবিধান অনুযায়ী কোনো বিদেশি নাগরিক বা দ্বৈত নাগরিকত্বধারী ব্যক্তি বিদেশি নাগরিকত্ব আইনগতভাবে ত্যাগ না করা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেন না। এ আদেশ বর্তমানে আপিল বিভাগে বহাল রয়েছে।

আবেদনে অভিযোগ করা হয়, সম্প্রতি আপিল শুনানিতে নির্বাচন কমিশন দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা প্রার্থীদের কাছ থেকে কেবল একটি ‘অঙ্গীকারনামা’ গ্রহণ করছে, যেখানে প্রার্থীরা উল্লেখ করছেনÑতারা নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করেছেন এবং তা প্রক্রিয়াধীন। এ প্রক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে কমিশন তাদের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করছে, যা স্পষ্টত সংবিধান এবং হাইকোর্টের রায়ের পরিপন্থী।

মামুন হাওলাদার তার আবেদনে আরো উল্লেখ করেন, নির্বাচন কমিশন বর্তমানে তাদের দেওয়া আপিল আদেশ পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন গ্রহণ করছে। তার দাবি অনুযায়ী, বর্তমান আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী কমিশনের এ ধরনের পুনর্বিবেচনার কোনো আইনি এখতিয়ার নেই।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় পোষ্ট